আপনার স্বাস্থ্য

ডাঃ হেলাল কামালি

জলাতংক বা Rabies ( হাইড্রোফোবিয়া )

Ref-From:- Rabies Control Program ( WHO ) ( Professor Sarah Cleaveland ( University of Glasgow ) ( Infection control & research center (Int. Medical School Uni- Bristol )


 

 

জলাতঙ্ক হল (ss RNA) ভাইরাস ঘঠিত এক ধরনের জুনোটিক রোগ (অর্থাৎ এই রোগ টি প্রানী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় ।জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন প্রথম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর , ১৮৮৫ সালে ।

র‌্যাবডো ( রেবিস ) ভাইরাস এ রোগের মুল কারণ । ইহা লিসা ভাইরাস গ্রুফের অন্তর্ভুক্ত । মুলত আক্রান্ত প্রাণীর স্যাল্ভিয়া গ্ল্যান্ডের নিঃসৃত রস ( লালা ) ও স্নায়ুতে এ ভাইরাস অবস্থান নেয় এবং পরবর্তীতে যেকোন ভাবে সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করলেই -ভাইরাসটি আক্রান্ত স্থানের নার্ভটিস্যুতে প্রবেশ করে এবং প্রতিদিন ১২-২৪মিমি করে ব্রেইন এবং স্পাইনাল কর্ডের দিকে এগুতে থাকে। রেবিস ভাইরাস একবার ব্রেন টিস্যুতে প্রবেশ করলে মৃত্যু ১০০% নিশ্চিত।

৯৩% বেলায় রেবিস ভাইরাস আক্রান্ত কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে মানুষের জলাতংক হয় —এ ছাড়া বাকি ৭% বিড়াল, শেয়াল, বাদুর , বানর, গরু, ঘোড়ার কামড় কিংবা আঁচড় থেকেও এই রোগ ছড়াতে পারে । মোট কথায় আক্রান্ত প্রাণীর লালা যে কোন ভাবে মানুষের শরিরে প্রবেশ করতে পারলেই উক্ত প্রাণী জলাতংক অসুখে আক্রান্ত হয়ে থাকে ।

 

 

এখানে একটি কথা জেনে রাখা প্রয়োজন — সুস্থ কুকুর বা প্রাণী কামড়ালে রেবিস হয় না । রেবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর (পাগলা কুকুর) কামড়ালে বা ক্ষতস্থানে চেটে দিলে সে ব্যক্তি রেবিসে আক্রান্ত হন ইহা নিশ্চিত ।

তারপর ও যদি কুকুরটি সম্মন্ধে ১০০% নিশ্চিত না হতে পারেন অথবা ১০ দিন পর্যবেক্ষণে না রাখতে পারেন অথবা কেউ মেরে ফেলে ইত্যাদি তা হলে একটু ও দেরি না করে রেবিস ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরী । আর যদি দেখা যায় কুকুর টি ১০ দিনের ভিতর মারা যায়নি , তা হলে মনে করা হয় কুকুরটি রেবিস ভাইরাসে আক্রান্ত নয় ।

সেই সাথে যদি রক্তপাত হয় ও ত্বকের ক্ষত স্থানে কামড়ের দাগ পাওয়া যায় ও প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় তাহলে টিকার পাশাপাশি হিউম্যান রেবিস ইমিউনোগ্গ্নোবিউলিন দিতে হবে ( বিস্থারিত চিকিৎসা পর্বে দেখুন )

মনে রাখবেন !!!!! লক্ষন প্রকাশের ১ থেকে ৭ দিনের মাঝে রোগীর যতই চিকিৎসা করা হোক না কেন, শেষমেশ রোগি মারা যাবে ইহা ১০০% নিশ্চিত ।!! কিন্তু কামড়ের সাথে সাথে যদি তড়িৎ ভ্যাকসিন ও অন্যান্য ব্যাবস্থা গ্রহন করেন , তাহলে ৯৭% নিশ্চিত সুস্থ থাকার । এ ছাড়া কুকুর বা বিড়ালে কামড়ালে যদি তাদের শরীরে র‌্যবিসের জীবাণু না-ও থাকে তারপর ও টিকা নিতে কোন অসুবিধা নাই বরং নিরাপদ থাকলেন বলে ম্নে করি ।

 

 

লক্ষন ও আচরন ঃ-

 

সতর্কবাণী ঃ- ( কুকুর কামড়ানোর ১০ দিন পর (সাধারণত ৩ থেকে ৭ সপ্তাহের মধ্যে) জলাতন্কের প্রথম লক্ষণগুলো দেখা দেয়৷ তাই যে কোন ভাবে লক্ষণ প্রকাশের পূর্বে চিকিৎসা শুরু করতেই হবে৷ )

লক্ষন নিরভর করে কামড়ের ধরন, স্থানের ওপর। এটা হতে পারে ৪ দিন থেকে ১ বছর। তবে ৮১% বেলায় ২০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এবং জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগি কুকুর কামড়ের দিন থেকে শুরু করে ৭০% রোগি মারা যায় ৫৯ দিনের ভিতর ।

প্রথমত ঃ ২- ১০ দিনের মধ্যে – সাধারণ জ্বরের মত, পা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, অবসাদ, বমিভাব, খিদের অভাব, জ্বর ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। । এরপরই দেখা দেয় মারাত্মক লক্ষণ যার নাম জ্বল + আতঙ্ক = জলাতঙ্ক

 

 

মস্তিষ্কে রেবিস ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে

 

কামড়ের জায়গায় ব্যথা ও চিনিচিন করে– ঢোক গিলতে ব্যথা ও খিঁচুনি হয় –এ সময় পানি পান করতে গেলেই গলার মাংসপেশিতে প্রচণ্ড সংকোচন হয়। পানির পিপাসা খুব বেড়ে যায় তারপর ও রোগী পানি দেখলেই আতংকিত হয় বা ভয় পায়। খাবার খেতে খুবই কষ্ট হয় ।

মুখ থেকে লালা ঝরে । সেই সাথে —

ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া এবং প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়ার মত ভাব — হটাৎ আচরণে পরিবর্তন হওয়া অথবা অস্বাভাবিক পাগলের মত আচরণ করা। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া –মাঝে মাঝে রোগি হিংস্র হয়ে ওঠা , সে সময় কেউ কেউ কামড় অথবা আঁচর দিতে চেস্টা করে — আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে আতংক বেড়ে যায় । সেই সাথে–

অন্যরকমভাবে কন্ঠে ডাকা ( হেলুসিনেশনের প্রভাব ) । খিঁচুনি, ঘুম না আসাসহ নানা ধরনের মারাত্মক কার্যকলাপ দেখাদেয়। লক্ষণ প্রকাশের ২-১৭ দিনের মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায় ।

 

 

চিকিৎসা ঃ

 

টিকা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সময় শিখানো হয়েছিল নাভির গোড়ায় মোটা সুই দিয়ে ১৪টি ইনজেকশন দেওয়ার, এখন আর তা নেই । বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ চেস্টায় সেই কস্ট লাগব হয়েছে । এখন ছোট সুই দিয়ে চামড়ার মধ্যে সাধারণ ইনজেকশনের মত ইঞ্জেকশন দিলেই হয় । এতে ব্যথা পাওয়া যায় না বললেই চলে ।

জলাতঙ্কের চিকিৎসা বিশ্ব স্বাস্থ্যের বিধি অনুসারে চিকিৎসকরা তিনটি ধাপে করে থাকেন চিকিৎসকরা —

 

ক্যাটাগরি-১ ঃ-

যদি ত্বকে কোনো ক্ষত না থাকে এবং রেবিড পশু যদি জিহ্বা দিয়ে চাটে তাহলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই বরং ভাল এয়ান্টিসেপ্টিক কিছু দিয়ে জিবানু মুক্ত করে ধোয়া উচিৎ ।

 

ক্যাটাগরি-২ ঃ-

যদি পশুর আঁচড়ের দাগ দেখা যায় তবে কোনো রক্তক্ষরণের ঘটনা না ঘটে তাহলে ভ্যাকসিন দিতে হবে। ভ্যাকসিন দিতে হয় ৫টি। পশু কামড়ানোর পরপরই টিকা নেওয়া উচিত এবং তা ৫ দিনের মধ্যে নিলে সবচেয়ে ভাল ।

ভ্যাকসিনের সময় সুচি ঃ- টিসিভি এর বর্তমান ডোজ ০.১ মিলি করে তুবে দুই বাহুতে ১ম দিন, ৩য় দিন, ৭ম দিন ও ২৮তম দিনে দিতে হয়। প্রেগন্যান্ট মহিলাকেও এটি দেয়া যাবে

 

ক্যাটাগরি-৩ঃ-

যদি ত্বকের ক্ষত স্থানে কামড়ের দাগ পাওয়া যায় ও প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় তাহলে টিকার পাশাপাশি হিউম্যান রেবিস ইমিউনোগ্গ্নোবিউলিন দিতে হয়।

পশু আঁচড় বা কামড় দিলে সঙ্গে সঙ্গে কাপড় কাচা সাবান দিয়ে ১৫ মিনিট ধরে ধুতে হবে। মনে রাখবেন ক্ষতস্থানে কোন সেলাই দিবেন না বা বরফ, চিনি, লবন ইত্যাদি ক্ষারক পদার্থ ব্যাবহার না করা ভাল । শুধু অতিরিক্ত রক্তপাত হলে সেটি বন্ধের ব্যবস্থা নিবেন- সেকেন্ডারি ক্লোজার হিসাবে ।

প্রথম ডোজের ভ্যাক্সিন দেয়ার সাতদিনের মাঝেই এটা দিতে হবে। এটি ক্ষতস্থানে (২০IU/Kg maximum 1500IU) ইনফিল্ট্রেট করে দেয়া হয় বা ডেলটয়েড মাসলে ও দেওয়া যায় । সেই সাথে চিকিৎসক চাইলে – অবশ্যই টেটেনাস ভ্যাকসিন- এন্টিমাক্রোভিয়েল ড্রাগস ইত্যাদি দিতে পারেন তবে অনুরোধ থাকবে রেবিস ইমিউনোগ্গ্নোবিউলিন দেওয়ার আগে এলারজি রিয়েকশন টেস্ট করে নেওয়ার ( অন্তত এড্রিনালিন, এফেড্রিন, এভিল ইত্যাদি এন্টি-এলারজেটিক এম্পোল গুলো যেন সাথে থাকে )

 

 

পরিবারের কারও জলাতংক হলে যা করনীয় ঃ-

রোগির চিকিৎসার সময় সেবাযত্নকারীকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে আক্রান্ত রোগীর প্লেটের অবশিষ্ট খাবার খাওয়া যাবে না। রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাবধানতার সঙ্গে ধুতে হবে। তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার, হাতে কাটাছেঁড়া থাকলে রোগীর চিকিৎসায় সেবাদানকারীকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ কাটা অংশ দিয়ে শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। অথবা কেউ কেউ কামড় বা নুখ দিয়ে আঁচড়ে ধরার চেস্টা করলে তা থেকে সতর্ক থাকবেন ।

 

 

সামাজিক কিছু কুসংস্কার বা কিছু ভ্রান্তধারণা ঃ

কেউ কেউ মনে করেন পাগলা কুকুরে কামড়ালে রোগীর পেটে কুকুরের বাচ্চা হয়ে যায় যা মোটেই ঠিক নয় ( আমার ব্যাক্তিগত জিবনে কয়েকজনের চিকিৎসা ও করেছি বা কয়জন আমার চুখের সামনে মারা যেতে ও দেখেছি – তবে পেটে বাচ্চা হতে দেখিনি – দেখেছি — ) তাই ইহা সম্পূর্ণ ভুল ধারনা ।

কুকুর কামড়ালে কেউ কেউ চিকিৎসকের পরিবর্তে ওঝা-গুণীন, কবিরাজ, হাতুড়েদের কাছে গিয়ে টুকি-টাকি ও ঝাড়-ফুঁক করান। কিন্তু যে কুকুরটি কামড়েছে সেটি যদি রেবিস ভাইরাস যোক্ত হয় – এবং আক্রান্ত মানুষটির যদি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে লক্ষন প্রকাশ পায় , তা হলে কোন অবস্থায় মৃত্যু আটকানো সম্বভ নয় । এই সব “ঝাড়ফুঁক ধরনের চিকিৎসা কোনো রোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না তাই বাটিপড়া, চিনিপড়া, মিছরিপড়া ইত্যাদি না করে কুকুরের কামড়ের ৫ দিনের ভিতর যে কোন ভাবে ভ্যাকসিন দিয়ে নিরাপদ থাকার চেস্টা করবেন ।

রেবিস আক্রান্ত কুকুরের দুই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় :

 

উন্মত্ত আচরণঃ- অস্বাভাবিক ভাবভঙ্গি, উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়ানো, বিকৃত ক্ষুধা, বিকৃত আওয়াজ করা, শরীরে কাঁপুনি, বিনা প্ররোচণায় কামড়ানো, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, ডাক কর্কশ হওয়া, পক্ষাঘাতে পায়ের ভারসাম্য হারানো, অবশেষে শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু।

মৌন আচরণ : নিস্তেজ হয়ে ঝিমোতে থাকা, বিকৃত স্বরে ধীরে ধীরে ডাকা, মানুষের চোখের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি ও পক্ষাঘাত দেখা দেয়া এবং সবশেষে মুত্যৃ। সাধারণত রোগ লক্ষণ প্রকাশের সাত দিনের মধ্যেই কুকুরটি মারা যায়। যদি কামড়ানোর ১০ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশিত না হয়, তবে কুকুরটি রেবিসে আক্রান্ত নয় বলে মনে করতে হবে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই ।

 

কুকুরে কামড়ালে চিকিৎসা বিষয়ে – যে বিষয়গুলির ব্যাপারে সাবধান থাকা জরুরিঃ

 

আক্রান্তব্যক্তিরভীতিদূরকরতেহবে।– কুকুরযাতেপরপরঅনেককেকামড়াতেনাপারেসেদিকেলক্ষ্যরাখতেহবে – ভালকরেক্ষতস্থানসাবানওপ্রচুরপানিদিয়েধুতেহবেএবংশুকানোরপরশুকনাকাপড়দিয়েঢেকেরাখতেহবেযেনইনফেকসননাহয় — কখনোইক্ষতস্থানকাটবেনাবাশুষবেনা, এতে ইনফেকসন হতে পারে।– কখনোই ক্ষতস্থানে বরফ লাগাবে না, এতে ফ্রস্ট বাইট হতে পারে।– কখনোই ক্ষতস্থানে ইলেক্ট্রিক সক দেবে না।– কখনোই ক্ষতস্থানে তাগা বা ডোরা (টরনিকুয়েট) বাঁধবে না, যেটি সাপে কামড়ালে বাঁধতে হয়।

 

3 comments on “জলাতংক বা Rabies ( হাইড্রোফোবিয়া )”

  1. Sheikh Md Alamgir

    May 20, 2015

    Very much benificial Article

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

আপনার অভিমত

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

আর্কাইভ

স্বাস্থ্য

%d bloggers like this: