আপনার স্বাস্থ্য

ডাঃ হেলাল কামালি

ঘুম – ৩য় পর্ব ( বোবায় ধরা বা Sleep paralysis)

in40

ঘুম – ৩য় পর্ব ( বোবায় ধরা বা Sleep paralysis)

Ref from:- CRICBristol ( MSU of Bristol ) National sleep foundation ( NHS )- Royal collage of Physician ( UK ) Professor A J Williams ( Sleep Specialist- Sleep council, Bristol ) and loots– Created by : Dr.H Kamaly


 

বোবায় ধরা আসলে কি?

বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস একটি সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়জনিত ব্যাপার। এ অবস্থায় মানুষের মন সজাগ থাকে কিন্তু শরীর অচেতন থাকে । বোবায় ধরার ঘটনাকে অনেকে বোবা ভুত ধরা বলে থাকেন । যার আসল নাম হচ্ছে স্লিপ প্যারালাইসিস কিংবা Hypnagogic Paralysis । মুলত অসুখ টি একটি স্নায়বিক ব্যাধি যা নারকল্যাপ্সির পাশাপাশি একটু অসুখ ।

এক্ষেত্রেব্যাপারটাএকটুজটিলআরতাহচ্ছেআমাদেরঘুমেরমধ্যে২টাপর্যায়আছে।এগুলোহল- ১) REM (Rapid Eye Movement)– ২) Non REM (Non Rapid Eye Movement) ( বিস্তারিত ঘুম ১ম পর্বে দেখুন )

ঘুমের মধ্যে এ দুটি চক্র পর্যায়ক্রমে আমাদের মাঝে আসে। আমরা যদি কোনভাবে এই দুটি চক্রের মাঝের সময়ে জেগে যাই তখনই আমরা হাত-পা নাড়তে পারি না। কথা বলতে পারিনা। কারন আমাদের এই জেগে থাকা সম্পর্কে মস্তিষ্ক অবগত থাকেনা। এ ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ সময় শরীররে নাড়াচাড়া বন্ধ থাকে অথচ সজাগ আছেন এমন অবস্থায় যে কোন বোবায় ধরা ব্যক্তি প্রায়ই ভয়ের কোন দৃশ্য দেখতে পারেন (যেমন, ঘরের ভেতরে কারো অনাকাংখিত কিছুর উপস্থিতি অথচ তিনি জেগে জেগে দেখেছেন তবে নড়াচড়া করতে পারেন নাই ) –

কেউকেউ সে সময় শ্বাসনিতেনাপারারকারণেবুকেরউপরচড়েবসেথাকে কি যেন একটা মনে করেন ( ইসলাম ধর্মীয় অনুভুতির অনেকে বলেন জ্বিনবাশয়তান ভর করেছিল এবং হিন্দু ধর্মীয় অনুভুতির -মাকালীভরকরেছিল বা খ্রিস্টানরা মনে করেন এলিয়েন ভর করেছিল ইত্যাদি —http://en.islamtoday.net/node/1711– অথবাhttp://www.sunniforum.com/forum/showthread.php?34365-Sleep-Paralysis )

 

ব্যাখা ঃ-

আসলে মস্তিস্ক তখন স্বপ্নের মত দৃশ্য তৈরি করে রেম ঘুমে পতিত হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে – সেই ফাঁকে অনেকে ভুত-প্রেতও দেখে ফেলতে পারেন বা বুকে চাপ দিয়ে কিছু মেরে ফেলছে ইত্যাদি নানান ধরনের স্ক্যেরি জাতীয় বিষয় দেখতে পারেন ! এর মূল কারণ হলো মস্তিষ্কের মধ্যভাগে হাইপার ভিজিলেন্স স্টেট একটিভ্যাশনের কারণে। ভিজিলেন্স সিস্টেম সাধারণত শরীরকে রক্ষাকারী এক ধরণের মেকানিজম যা বিভিন্ন বিপদের মাত্রাকে আলাদা করে। অনেকেই মনে করেন অলৌকিক কিছু এই অবস্থার সৃষ্টি করে। কিন্তু আসলে এটি সম্পূর্ণই শারীরবৃত্তীয় একটি ব্যপার ।

অন্যদিকে শ্বাস নিতে না পারার কারণে বুকের উপর চড়ে বসে থাকে কি যেন একটা মনে করেন তার মুল কারন, মূলত ভিজিলেন্স সিস্টেমের অতি সতর্কতা এবং সেইসব মাসলের প্যারালাইসিস ভাব হওয়া, যা কিনা সাময়িক ভাবে নিঃশ্বাস বন্ধের কারণ ঘটায়। আরআইএম এর বিভিন্ন নিঃশ্বাস প্রক্রিয়াও এর সাথে জড়িত।

 

( ফিজিও-বায়োক্যামিস্ট্রি ও প্যাথলজিক্যাল কিছু সুত্র )

এর মুল কারন হছছে আমাদের এই জেগে থাকা সম্পর্কে মস্তিষ্ক কিছু সময় অবগত না থাকায় নার্ভ রিসিপ্টর গ্লিসিন ( এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার ) এবং মেটাবট্রপিক গাবা (gamma-aminobutyric acid ) সেন্সর অনুভূতিকে ব্লক করে রাখে এবং কিছুটা অক্সিজেনের ও অভাব হয় এবং সে কারনেই আমরা অস্বাভাবিক অনেক কিছু দেখতে পাই। মুলত একেই বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস বলা হয়ে হয় ।

অন্য দিকে – অটো-ইমিউনিটি সিস্টেম শরীরের উৎপন্ন প্রোটিন থেকে মস্তিষ্ক কোষে হাইপোসারটিন বা অরেক্সিন

( অরেক্সিন হচ্ছে এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যার কাজ হল শরীরের- উত্তেজনা, অনিদ্রা, এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সারা শরীরের মাংসপেশির সাথে স্নায়ুবিক স্পর্শকাতা সোমাটো সেন্সুরি কারটেক্সে পৌঁছে দেওয়া – এর অন্য নাম নিউরো- অপেপ্টাইড হরমোন – মানব মস্তিষ্কে কয়েক মিলিয়ন স্পর্শকাতর কোষের মধ্যে মাত্র কয়েকশ কোষ এই অরেক্সিন উৎপাদন করে )

উৎপাদন করতে পারেনা বিধায় ক্ষেন্দ্রিয় স্নায়ু তন্ত্র গভীর ঘুমের সময় শরীরের অন্যান্য অংশের খবর রাখতে পারেনা ঠিক সে সময়কেই আমরা বোবায় ধরে বলে থাকি বা নার্ভ রিফ্লেক্স কে ভৌতিক কিছু দেখিয়ে থাকে । অবশ্য সে সময় মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা ও সর্ব নিম্ন স্থরে পৌঁছে যায় ।

যদি ও এইসব নিউরোট্রান্সমিটার সমুহ ঘুমুতে যাবার সময় কিংবা ঘুম থেকে জেগে উঠবার সময় যে কোন সময়েই হতে পারে- তারপর ও ঘুমের দ্বিতীয় স্থরেই বেশী হয় । যাকে রেম স্লিপের বিঘ্ন ঘটার কারন মনে করা হয় । ঘুমানোর পর যখন আমাদের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় অনুভূতি তন্ত্রে গ্লিসিন এবং মেটাবট্রপিক গাবার স্বল্পতায় সিগন্যাল পাসিং কমে যায় বা বন্ধ করে দেয় ( রেম স্লিপে ) – কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুম ভাঙার পরও মস্তিষ্ক সাথে সাথে মাসল সমুহে সিগন্যাল পাসিং শুরু করে না, যত সময় করবেনা ঠিক তথ সময় বোবায় ধরে থাকে ।

 

স্লিপ প্যারালাইসিসদুই ভাগে বিভক্ত

আইসোলেটেড স্লিপ প্যারালাইসিস ঃ ( Isolated sleep paralysis )

ইহা বিচ্ছিন্নভাবেঅনুভূতহতেপারে।বিশেষ করে জীবনে দু একবার অথবা বছরে দুএকবার ভয়ের কিছু দেখা বা অস্তিরতা যা খুবই অল্পসময় ধরে স্থায়ী হয়।

লক্ষণ ঃ-

বোবায় ধরলে একেক জনের অনুভুতি একেক রকম হয়ে থাকে ঃ- কেউ ঘরের ভেতর অশরীরি কোনো কিছুর উপস্থিতি টের পান ( ভুত-পেত্নি-ইত্যাদির মত ) আবার কেউ দুর্গন্ধ পান আবার কেউ কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণীর দেখে থাকেন- কেউ কেউ গর্জন বা শব্দের প্রতিধ্বনি ইত্যাদি যা গল্প বা ফিলমের ছবির মত কল্পিত দৃশ্য । সে সময় অনেকে ভয়ে চীৎকার করেন বা বা আর অনেক কিছু অথচ কাছে কেউ ঘুমে থাকলে ও শুনতে পায়না ( কাছের কেউ চীৎকার শুনতে পান যখন মস্তিষ্কের অরিক্সিন নিউরোট্রান্সমিটার কাজ শুরু করতে থাকে, সাধারন ভাষায় আমরা যাকে তন্দ্রা ফিরে পাই বলে থাকি ) – অনেকে বুকের উপর উঠে বসা ভয়ংকর মানুষ/প্রানী ইত্যাদি দেখতে পান –আর ও অনেক কল্প কাহিনী যা বাস্থবের সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন ।

বোবায় ধরা রোগীর তন্দ্রা ফিরে পাওয়ার পর শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরতে দেখা যায়- কেউ কেউ দম বন্ধ হয়ে আসতেছে মনে করেন এবং ভয়ের কারনে হার্টের গতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় বা বাচ্চারা কান্নাকাটি শুরু করে ইত্যাদি ।

 

রেকারেন্ট আইসোলেটেড স্লিপ প্যারালাইসিস। ঃ ( recurrent isolated sleep paralysis ) –

আইসোলেটেড স্লিপ প্যারালাইসিস বারবার বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে এমনকি এক রাতেও একাধিকবার হবার সম্ভাবনা থাকে । এ ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাপ্তিকাল বেশি হয়। যা খুব কম আক্রমন করতে দেখা যায় এবং সে জন্য সাথে সাথে ভাল ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্ষ নেওয়া খুবি জরুরী ।

 

কাদের বেশী হওয়ার সম্বাভনা ঃ-

প্রথমত বংশগত ও পরিবেষগত কারনে ( জীন হ্যেবিটেশন প্রক্রিয়ায় ) বিশেষ করে বংশে অতীতে কারো সিজোফ্রেনিয়া থাকলে সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই রোগের সম্ভাবনা ৪০% বেশী থাকে । আধ্যাত্মিক জগতের উপর, বিশেষ করে অ-বর্ণিত বিষয় সমুহের উপর নিয়ন্ত্রণ করার কিছু পদ্ধতি যাদের মনে আসে তারাই স্লিপ প্যারালাইসে বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকেন । যারা চিৎ হয়ে ঘুমান তাদের স্লিপ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি থাকে । খুব টাইট পোশাক পরে যাদের ঘুমানোর অভ্যাস – যাদের ঘুমের নির্দিষ্টতা নাই , মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সমস্যা, হাত-পায়ের মাংসপেশিতে খিঁচ ধরা, বিষণ্নতা ইত্যাদি অনেক কারণও এই স্লিপ প্যারালাইসিস হওয়ার সম্বাভনা বেশী ।

 

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ঃ-

আইসোলেটেড বোবায় ধরার জন্য প্রাথমিক ভাবে তেমন কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নাই – তারপর ও যদি মানসিক ভাবে বেশী ভয় পেয়ে থাকেন তাহলে অভ্যাসগত কিছু দিক পরিবর্তন করার চেস্টা করুন । প্রথমেই জানতে হবে বোবায় ধরা কি? সেই সাথে স্লিপ হাইজিন মেনে চলতে হবে , যেমন চাইলে নিজ ধর্মীয় ঘুমানোর নীতি ও উপদেশ সমুহ মেনে চললেই ১০০% ভাল হওয়ার কথা । ( ইনসমোনিয়া বা অনিদ্রার পর্বে বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে ) – ঘুমের সময় চিঁৎ হয়ে না ঘুমিয়ে ডান অথবা বাম, যেকোন একদিকে কাঁৎ হয়ে ঘুমাতে হবে। এটি খুব কার্যকরী উপায়। ( বেশির ভাগ সময় ডান দিকে কাঁৎ হয়ে শুঁয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন ) এবং নিজের মনকে সবসময় উৎফুল্ল রাখা। দিনের বেলা ভয়ানক বা ভৌতিক কিছু চিন্তা করা বা ভৌতিক বিষয়ে কথপোকথন, টিভি বা রেডিওতে ভৌতিক কোন মুভি দেখা বা আলোচনা শোনা থেকে বিরত থাকা। ঘুমানোর সময় টাইট ধরনের জামাকাপড় না পরা ইত্যাদি । সেই সাথে মেলাটোনিন বৃদ্ধি কারক , ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ কিছু খাবার নিয়মিত খাওয়ার চেস্টা করবেন ( উক্তেজক খাবার- এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার রাতে না খাওয়া ভাল ) । দৈনিক খেলাধুলা অথবা ব্যায়াম করার চেস্টা করুন ।

 

রেকারেন্ট আইসোলেটেড স্লিপ প্যারালাইসিসের বেলায় অবশ্যই ভাল স্নায়ু এবং মানসিক বিশেষজ্ঞকে দেখানো উচিৎ । সাধারনত বিশেশজ্ঞরা শরীরের অন্যান্য কোন অসুখ না থাকলে , এন্টি-সাইকোটিক ড্রাগস ( The most commonly used drugs are tricyclic antidepressants and selective serotonin reuptake inhibitors ) ১৪ -২৭ দিনের জন্য দেওয়া হয়ে থাকে এবং মূল্যবান কিছু উপদেশ ( অভ্যাসগত এবং হাইজেনিক ) সাথে সম্পূরক খাবার বা ভিটামিন যোক্ত ঔষধ দিয়ে থাকেন ।

স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যদি কোন কারনে রেকারেন্ট আইসোলেটেড স্লিপ প্যারালাইসিস তৃতীয় ধাপে চলে গেলে রোগীর সম্পূর্ণ মানসিক বিকার দেখা দিতে পারে বিধায় দ্বিতীয় স্তরে থাকতেই ভাল মানসিক বিশেষজ্ঞকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে । সে সময় শুধু , মনোসাইকোটিক ( বিভিন্ন উপদেশ বানী- ও অভ্যাসগত হাইজিনের পরিবর্তন ) চিকিৎসার উপর ভর করে থাকা ঠিক নয় । শেষ মেশ স্থায়ী মানসিক ভারসাম্যতা দেখা দিলে অসুখ টাকে (Supernatural) বা “অদ্ভূদ রোগ বলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা —

 

 

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

ক্যাটাগরি

আপনার অভিমত

shaharparabd on ঘুম – ১ম পর্ব

আর্কাইভ

স্বাস্থ্য

%d bloggers like this: